নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজার দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে পুনরুদ্ধারের শক্তিশালী আভাস দিচ্ছে। তবে এই দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা মূলত নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কাঠামোগত সংস্কার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিক উন্নতির ওপর নির্ভর করবে। সোমবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতি প্রতিবেদনে (মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট) এসব তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাজারের গতিপ্রকৃতি ও সূচকের উত্থান
বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) জানায়, চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর প্রথমার্ধে মাঝে মাঝে উঠানামা থাকলেও বাজার সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বিশেষ করে লেনদেনের পরিমাণ ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারের গতিশীলতা ফেরার সুস্পষ্ট সংকেত পাওয়া গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৪,৮৩৮ পয়েন্টে, যা ডিসেম্বর শেষে ০.৬% বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৮৬৫ পয়েন্টে। এই ইতিবাচক ধারা পরবর্তী সপ্তাহগুলোতেও অব্যাহত থাকে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে সূচকটি ৫,২০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, গত বছরের ৪৭২ কোটি টাকার তুলনায় চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর প্রথমার্ধে গড় দৈনিক লেনদেন ৬৫০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।
আধুনিকায়ন ও সরকারি উদ্যোগ
শেয়ারবাজারকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করতে সরকার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে সরকারের শেয়ার ধারণ কমানো, স্থানীয় ভালো কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে উৎসাহিত করা, কারসাজি রোধ এবং কর সুবিধা প্রদানের মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও উল্লেখ করেছে যে, ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জ’ চালু করা এবং ‘ব্লকচেইন’ ভিত্তিক ব্যাক-অফিস সিস্টেম প্রবর্তন করা হলে বাজারের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও সুসংহত হবে। একটি দক্ষ বন্ড মার্কেট এবং আর্থিক বাজারকে আরও গভীর করতে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনেছে। এর মধ্যে ‘মার্জিন রুলস ২০২৫’ মার্জিন ট্রেডিংয়ের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করেছে। এছাড়া আইপিও, মিউচুয়াল ফান্ড এবং পাবলিক ইস্যু বিধিমালার প্রস্তাবিত আপডেটগুলো স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে ‘শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল’ গঠনকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেকেন্ডারি মার্কেটে মোট ২৩২টি সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সক্রিয় লেনদেন হয়েছে। এই মাসে সরকার ছয়টি বিনিয়োগ সুকুকের মাধ্যমে ২৪০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহ করেছে, যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রানীতি পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সহায়তা করেছে।
সেকেন্ডারি মার্কেটকে আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দেশনা জারি করেছে, যেখানে প্রাইমারি ডিলারদের প্রতিটি কার্যদিবসের প্রথম ঘণ্টায় ট্রেজারি বন্ডের জন্য দুই-মুখী (ক্রয়-বিক্রয়) দর প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে।

